এই কুরুচিপূর্ণ কমেন্টটি ইউনিসেফের বাল্যবিবাহবিরুদ্ধ পোস্টের নিচে একটি কমেন্ট। ‘আগে বাংলাদেশি’ যেহেতু বাংলাদেশের নৈতিকতার শিক্ষকের ভূমিকাটি নিতে বাধ্য তাই এ প্রসঙ্গে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করা যাক। এধরনের কমেন্ট না করা অনেক জনগণ আছেন। তারা মনে করেন পনেরো বছর বয়সে মেয়েরা এবং ছেলেরা যদি প্রেম করে, বিয়ে কেন করা যাবে না? এদের ভোট পাওয়ার জন্য আমরা সেই আলাপ এড়িয়ে যাবো না।

বিয়ে কী

বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ যৌনকর্ম-বঞ্চিত (সেক্স-ডিপ্রাইভড)। কাজেই যে কোন যৌনসম্পর্ক যেহেতু তারা নিজের করতে পারছেন না, অন্য কাউকে না করতে দেয়ার একটা পুলিশি মনোভাব আছে। বিয়ের অর্থ স্রেফ যৌনমিলন, তেমনটা ভাবারও একটা প্রবণতা আছে। অথচ বিয়ে একটি আইনী চুক্তি। এর সাথে যৌনতার থেকে বড় হয়ে আসে দায়িত্ব যা আপনাকে পালন করতেই হবে, নইলে আপনাকে আদালতে তোলা যাবে।
বিয়ের অর্থ দুই ব্যক্তি পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব কাঁধে নেয়, আইন অনুযায়ী যৌন সম্পর্ক, সহবাস ও সন্তান ধারণ বৈধ হয়, কিন্তু একইসাথে আসে খোরপোষ, সম্পত্তির অধিকার, বিচ্ছেদে ক্ষতিপূরণ, সন্তান পালনের দায়— যা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
একজন ১৫ বছরের কিশোরী এই দায়গুলো বুঝবে কীভাবে? একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেও অনেক সময় আইনের এই জটিল দিকগুলো বুঝে উঠতে সময় লাগে, সেখানে একজন বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়ের পক্ষে তা বোঝা অসম্ভব। তাই বিয়েকে যৌনতায় নামিয়ে আনা শুধু কুরুচিপূর্ণ নয়, মানসিক অপরিপক্বতা ও অজ্ঞানতা প্রকাশ করে।

তাহলে ১৫ বছর বয়সে প্রেমিক থাকা যাবে না?

এই প্রশ্নে সৎ থাকা দরকার। উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, থাকতে পারে। ১৫ বছরের একজন কিশোরী বা কিশোর মানসিক ও শারীরিকভাবে বয়ঃসন্ধিতে প্রবেশ করে। এই সময় হরমোনের পরিবর্তন, পরিচিতি ও সম্পর্কের আকর্ষণ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আবেগ সব মিলিয়ে একজন মানুষ মানবিক সম্পর্কের চর্চা শুরু করে।
এই আবেগ যদি পরিপক্ব, সমঝদার, সামাজিকভাবে নিরাপদ ও সম্মতিপূর্ণ হয়, তাহলে তা এক ধরনের বয়সোপযোগী প্রেম বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য, প্রেম থাকলেও আইন ও সমাজ তাকে যৌনতা বা সহবাসের অধিকার দেয় না, কারণ এই বয়সে নিরাপত্তা, সম্মতি, শারীরিক ঝুঁকি ও মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া এখনও অসম্পূর্ণ। তবে প্রেম থাকা অপরাধ নয়। জোর করে বিয়ে চাপিয়ে দেওয়া অপরাধ।
১৫ বছরের একটি মেয়ে যদি ১৫ বছরের একটি ছেলের সাথে প্রেমে জড়ায়, এটি আইনগতভাবে শিশুদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে পড়ে, যা কোনোভাবেই অপরাধ নয় যতক্ষণ না এতে জোরপূর্বকতা বা পরিণতির দায় যুক্ত হয়। উভয়েই মাইনর হওয়ায়, আইন সাধারণত একে “নাবালক পারস্পরিক সম্পর্ক” হিসেবে দেখে এবং ফৌজদারি অপরাধে রূপ দেয় না, যদি তৃতীয় পক্ষের জোর বা প্ররোচনা না থাকে। সামাজিকভাবে, এ ধরণের সম্পর্ক অনেক সময় উপহাস, অনুৎসাহ কিংবা অভিভাবকীয় হস্তক্ষেপের শিকার হয়, তবে তা একটি বয়সোপযোগী আবেগের প্রকাশ হিসেবে বুঝতে হবে। সমস্যার মূল জায়গা হয় যখন এই সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বিয়ে, সহবাস বা সন্তান ধারণের চাপ আসে, যা উভয়েরই আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে। তাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে এর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রিত, সমঝদার, সহানুভূতিশীল ও অভিভাবক-সহায়ক, যেন শিশুরা আবেগ অনুভব করতে পারে, আবার ঝুঁকিতে না পড়ে।
‘আগে বাংলাদেশি’ সব সময় মাইনরদের রক্ষা করার কথা বলে, তাদের আবেগ-অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় রাজনীতি করার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান।

ধর্মীয় রাজনীতি

‘আগে বাংলাদেশি’ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে ধর্মের নামে বা পাপের ভয় দেখিয়ে, সমাজের চোখ রক্ষার অজুহাতে, কিংবা আল্লাহর গজবের ভয় দেখিয়ে কোনো মাইনর ছেলেমেয়েকে বিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া এক ধরনের সহিংসতা, আর আমরা এই সহিংসতার বিরুদ্ধে আপোষহীন।
বাংলাদেশে বহু পরিবারে দেখা যায়, যখন ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে কারো প্রতি ভালোবাসা বা আকর্ষণ দেখায়, তখন বলা হয় “পাপ হবে”, “আল্লাহ দেখছেন”, “নাম খারাপ হবে”, ইত্যাদি। অথচ এই বয়সে কারো প্রতি আবেগ থাকা মানবিক, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বাভাবিক এবং বিকাশপ্রক্রিয়ার অংশ। ‘প্রেম হলে পাপ, কিন্তু বিয়ে করলে পুণ্য’এই বিকৃত ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হয়েছে।
ধর্মীয় গোঁড়ামির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য। ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারীশরীর, যৌনতা ও সম্পর্ককে ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের উপকরণ বানিয়েছে। তারা মাইনরদের প্রেমকে অপমানের জায়গায় নামিয়ে এনে বলে “তুমি যদি প্রেম করো, তাহলে এখনই বিয়ে করো। নইলে তুমি ব্যভিচারিণী।”
এভাবে নাবালিকা মেয়েদের প্রেম থেকে বিয়ে এবং বিয়ের মধ্য দিয়ে এক অন্ধ জীবনচক্রে আটকে ফেলা হয় যার মাধ্যমে সমাজে পিতৃতন্ত্র ও ধর্মীয় আধিপত্য বজায় থাকে।
আমাদের পার্টি মনে করে, প্রেম মানবিক, কিন্তু মাইনর বিয়ে অপরাধ। তাই আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে কিশোরীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিয়ে নামের শৃঙ্খলে বাঁধার অপচেষ্টাকে ঘৃণা করি এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নেই। কারণ নৈতিকতা মানে ভয় না দেখিয়ে বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।

তাহলে প্রেম চলবে, কিন্তু বিয়ে হবে না কেন?

কারণ প্রেম একান্ত ব্যক্তিগত, কিন্তু বিয়ে সর্বজনীন দায়। প্রেমে কারো কাছ থেকে কেউ খোরপোষ চায় না, শিশু চায় না, সম্পত্তির ভাগ চায় না। কিন্তু বিয়েতে এসব আইনসম্মত ও সমাজস্বীকৃত দাবি হয়ে দাঁড়ায়।
১৫ বছরের একজন নিজের শরীর ও মনের পরিবর্তনই পুরোপুরি বোঝে না, ভবিষ্যৎ জীবিকা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, মাতৃত্ব— এসব বিষয়ে কোনো বাস্তব ধারণা রাখে না, ফলে সে যদি সংসার না চালাতে পারে, তাহলে দায় গিয়ে পড়ে তার পরিবার বা স্বামীর পরিবারে, যা নির্যাতন ও অবহেলার কারণ হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে ১৫-১৯ বছরের মা ও শিশুর মৃত্যু, অপুষ্টি, স্কুল-ছাড়া, দারিদ্র্য ও গার্হস্থ্য সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি। ‘আগে বাংলাদেশি’ সবসময় মাইনরদের রক্ষা করার কথা বলে। তাদের আবেগ-অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ফাঁদ পাতার বিরুদ্ধে আমরা সংবিধান, বিজ্ঞান ও মানবিকতার পক্ষ নিয়ে লড়ি।

 

#

No responses yet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Page Views
5319

JOIN US!

Join Us!