আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার’ (Monopoly on violence)। কিন্তু এই অধিকারের প্রয়োগ কীভাবে হবে, তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টিকে থাকা। বিশেষত, ধর্মীয় বা আদর্শিক উগ্রবাদী গোষ্ঠী যখন রাস্তায় সহিংস আন্দোলন বা ভাঙচুর করে, তখন রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র (Lethal force) ব্যবহারের ফলাফল প্রায়শই বুমেরাং হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং পূর্ববর্তী সরকারের বলপ্রয়োগের নীতি প্রমাণ করে যে, কেবল গুলি করে বা হত্যা করে কোনো আদর্শিক আন্দোলন দমন করা যায় না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

বলপ্রয়োগের ‘বুমেরাং প্রভাব’ এবং মার্টিয়ারডম সিনড্রোম (The Backfire Effect and Martyrdom Syndrome)

সমাজবিজ্ঞানী ব্রায়ান মার্টিনের ‘ব্যাকফায়ার থিওরি’ (Backfire Theory) অনুযায়ী, রাষ্ট্র যখন মাত্রাতিরিক্ত এবং দৃশ্যমান সহিংসতা ব্যবহার করে, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সহানুভূতি তৈরি করে। ধর্মীয় মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে এই সমীকরণ আরও ভয়াবহ। তাদের নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোকে তারা ‘শহীদ’ বা ‘Martyr’ হিসেবে মহিমান্বিত করে।

রাষ্ট্র যখন গুলি চালায়, তখন তারা কেবল একজন ব্যক্তিকেই হত্যা করে না, বরং ওই গোষ্ঠীর রিক্রুটমেন্টের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা বা ন্যারেটিভ তুলে দেয়। নিহতদের রক্ত মৌলবাদী সংগঠনগুলোর জন্য সঞ্জীবক সুধা হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ব্যর্থতার জায়গাটি এখানেই—তারা মনে করেছিল, দমন-পীড়ন এবং ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে আদর্শিক কট্টরপন্থিদের চিরকাল দাবিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন মূলত চরমপন্থীদের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে জনসমর্থনের মূলধারায় নিয়ে আসে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের বিক্ষোভ ও তাণ্ডব (২০২৫-২০২৬):

মার্কিন সরকারের ইমিগ্রেশন নীতি (ICE রেইড) এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০২৫ সালের জুন এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে তা দাঙ্গায় রূপ নেয়—ব্যাপক ভাঙচুর হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চলে এবং পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা ও প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করা সত্ত্বেও LAPD (লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট) এবং ন্যাশনাল গার্ড কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র (Lethal weapon) বা লাইভ অ্যাম্যুনিশন ব্যবহার করেনি। তারা কৌশলগত ঘেরাও (Containment), টিয়ার গ্যাস, পেপার বল এবং গণগ্রেপ্তারের (Mass arrest) মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। শত শত মানুষ গ্রেপ্তার হয়, পুলিশসহ অনেকে আহত হয়, কিন্তু একজন বিক্ষোভকারীও নিহত হয়নি। একটি লাশও না পড়ার কারণে আন্দোলনকারীরা সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে কোনো ‘মার্টিয়ারডম’ বা শহীদি ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারেনি। ফলে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে আইনি ও কাঠামোগত সীমানার ভেতরেই স্তিমিত হয়ে যায় এবং রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান (২০২৪):

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি অহিংস ছাত্র আন্দোলন জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। আন্দোলন চলাকালে ব্যাপক ভাঙচুর, পুলিশের সাথে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ সরকার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের পথে না হেঁটে সরাসরি চরম বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালায় এবং রাজপথে ‘শুট-অ্যাট-সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শত শত ছাত্র-জনতা নিহত হয়। এই মাত্রাতিরিক্ত প্রাণহানি এবং প্রতিটি তাজা লাশ সমাজের প্রতিটি স্তরে ক্ষোভের দাবানল তৈরি করে। নিহতরা ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তাদের রক্ত আন্দোলনকে একটি অপ্রতিরোধ্য গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর করে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটে।

‘শূন্য-নিহত’ বা জিরো-ক্যাজুয়ালটি নিয়ন্ত্রণ কৌশল (Zero-Casualty Crowd Control Strategy):

লস অ্যাঞ্জেলেসের উদাহরণটি আধুনিক নগর-নিরাপত্তা এবং ‘ট্যাকটিকাল ডি-এসকেলেশন’ (Tactical De-escalation)-এর একটি চমৎকার মাপকাঠি। উন্নত বিশ্বের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো চরমপন্থী বা সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে সরাসরি গুলির পরিবর্তে ‘কন্টেইনমেন্ট’ (Containment) এবং ‘মনস্তাত্ত্বিক পরিশ্রান্তি’ (Psychological exhaustion) কৌশল ব্যবহার করে।

১। কৌশলগত ঘেরাও ও বিচ্ছিন্নকরণ: আন্দোলনকারী বা জঙ্গিদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কৌশলগতভাবে আটকে ফেলা হয়, যাতে তারা সাধারণ জনগণের জানমালের ক্ষতি করতে না পারে এবং তাদের সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যায়।

২। অ-প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার: জলকামান, টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড বা আধুনিক ক্রাউড কন্ট্রোল মেকানিজমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করা হয় শুধুমাত্র ছত্রভঙ্গ বা নিবৃত্ত করার জন্য, হত্যার উদ্দেশ্যে নয়।

৩। শূন্য-নিহত নীতি (Zero Fatality Policy): একজন মানুষও যেন মারা না যায়, সেটি সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে নিশ্চিত করা। কারণ একটি লাশ মানেই একটি নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং নতুন ক্ষোভের সঞ্চার। যখন কোনো নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে না, তখন সহিংস আন্দোলনকারীরা জনগণের সহানুভূতি আদায় করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছে তারা ‘ভিকটিম’ সাজার সুযোগ হারায় এবং তাদের আন্দোলন জনসমর্থন হারিয়ে আপনাআপনি স্তিমিত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘমেয়াদে মৌলবাদ প্রশমনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা (Institutional Framework for Counter-Radicalization): মৌলবাদীদের শুধু রাস্তা থেকে সরালেই সমস্যার সমাধান হয় না। রাষ্ট্রের গভীরে এর প্রসারণ রোধে বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • আইনের শাসন ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (Extra-judicial killing) বা গুমের বদলে অপরাধীদের প্রকাশ্যে ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা। যখন একজন উগ্রপন্থীকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আইনিভাবে শাস্তি দেওয়া হয়, তখন সে আর হিরো বা শহীদ হতে পারে না, সমাজের চোখে সে কেবলই একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়।

  • প্রতি-আখ্যান (Counter-Narrative) তৈরি: মৌলবাদের মূল শক্তি তাদের মতাদর্শ এবং ইমোশনাল ন্যারেটিভ। রাষ্ট্র ও সমাজকে এর বিপরীতে শক্তিশালী, যৌক্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রগতিশীল আখ্যান তৈরি করতে হবে। সাংস্কৃতিক জাগরণ, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া মৌলবাদকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত করা অসম্ভব।

  • অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি: প্রান্তিকীকরণ (Marginalization) এবং বঞ্চনাবোধ মৌলবাদের অন্যতম প্রধান জ্বালানি। রাষ্ট্রের প্রতি অভিমান থেকেই মানুষ চরমপন্থার দিকে ঝোঁকে। যুবসমাজের বেকারত্ব দূরীকরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের ‘রিক্রুটমেন্ট পুল’ হারায়।

যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের (তারা যতই চরমপন্থী বা বিভ্রান্ত হোক না কেন) হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, সেই রাষ্ট্র মূলত নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শাসনতান্ত্রিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে। মৌলবাদ বা যেকোনো উগ্র আন্দোলন দমনের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো ‘শূন্য-নিহত’ নীতি গ্রহণ করে তাদের কৌশলগতভাবে দুর্বল করা এবং আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোতে পরাস্ত করা। রক্তপাতের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত চরমপন্থীদেরই মূলধারার ক্ষমতায় নিয়ে আসে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমোঘ এবং প্রমাণিত সত্য।

#

No responses yet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Page Views
6023

JOIN US!

Join Us!