গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর যে ভুল ধারণাটি প্রচলিত আছে, তা হলো একে মেজরিটি যা চাইবে তাই করা হবে বা মব রুল (Mobocracy) হিসেবে ধরে নেওয়া। ইউনূসের আমলে যে স্টুপিড বাঙালি মব করেছে এবং তাকে গণতান্ত্রিক অধিকারও ভেবেছে তার পেছনে রয়েছে এই মানসিকতা।

সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে, যেহেতু কোনো একটি রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীর মানুষ সংখ্যায় বেশি (যেমন- ৯০%), তাই রাষ্ট্র চলবে কেবল তাদেরই খেয়ালখুশিমতো। তারা মনে করে, “জোর যার মুল্লুক তার”—অর্থাৎ যে মব বা উন্মত্ত জনতা রাজপথে শক্তি দেখাতে পারবে, তাদের কথা মেনে নেওয়াই হলো গণতন্ত্র। যেহেতু তাদের ভোট ৯০% তাই তাদের সব কথা শুনতে এবং তাদের মনমতোই আইনকানুন করতে এমপিরা বাধ্য!

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনো রাজনৈতিক দর্শন নয়, বরং একে বলা হয় টিরানি অফ দ্য মেজরিটি বা ডেমোগ্রাফিক বুলিং। মজার ব্যাপার হচ্ছে, উদারনৈতিক গণতন্ত্র এই ডেমোগ্রাফিক বুলিংয়ের ঠিক বিপরীত একটি ধারণা, যার মূল লক্ষ্যই হলো গুটিকয়েক বা ১% মানুষের অধিকারকে ওই ৯৯% মানুষের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা। যেহেতু ৯০% মানুষের ভোট রয়েছে, তাই তাদের সব কথা শুনতে বা তাদের মনমতো আইন করতে এমপিরা বাধ্য—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে, একজন নির্বাচিত এমপি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগের অন্ধ দাস বা প্রতিনিধি (Delegate) নন, বরং তিনি সমগ্র রাষ্ট্রের একজন ট্রাস্টি (Trustee), যার মূল দায়িত্ব নিজের সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও মানবিকতা দিয়ে রাষ্ট্রের ১০০% নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করা। ৯০% মানুষ যদি এমন কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত চায় যা বাকি ১০% মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার হরণ করে, তবে একজন প্রকৃত প্রতিনিধির দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠের সেই অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া নয়, বরং তাকে রুখে দেওয়া। এমনটা করামাত্র বাঙালি বেকুব জনতা বলতে শুরু করে “নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে এসব চলবে না। নব্বই পার্সেন্ট মুসলমান যা চাইবে তাই হবে। এটাই গণতন্ত্র!”

কিন্তু গণতন্ত্রের মূল কাজ সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তির কাছে মাথানত করা নয়; বরং সংবিধান ও মানবাধিকারের রক্ষাকবচ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুর অধিকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসন থেকে নিরাপদে রাখা।

প্রকৃত গণতন্ত্র কেবল মাথা গোনা বা হেডকাউন্টের গাণিতিক সমীকরণ না; এটা দাঁড়িয়েই আছে নাগরিক অধিকারের সমতার ওপর। সবাই সমান। গণতন্ত্রে ৯০% ভোট থাকা মুসলমানের যে ক্ষমতা, ১% ভোট থাকা নাস্তিকেরও একই ক্ষমতা। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যদি ৯০% মুসলমান সব অধিকারের ১৫০% নিয়ে ১% নাস্তিককে ৫০% দেয়, নাস্তিক ওই মুসলমানের ১৫০ এর বাড়তি ৫০% কেড়ে নিতে পারবেন। তখন বাঙালি মুসলমান মনে করেন তার অধিকার কমে গেল। অথচ তার অধিকার ১০০% এর বদলে ১৫০% ছিল এতদিন কারণ তারা নাস্তিকের ন্যায্য ৫০%ও খেয়ে ফেলেছিলেন। সেটাই ছিল বরং অগণতান্ত্রিক।

তারা এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় যে, তাদের অধিকার আদৌ কমেনি, বরং অন্যের ন্যায্য অধিকার হরণ করে অতিরিক্ত যে অংশটুকু তারা এতদিন অবৈধভাবে ভোগ করছিল, গণতন্ত্র কেবল সেই অগণতান্ত্রিক জবরদখলের অবসান ঘটিয়ে সবার জন্য সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস ডি টকভিল এবং জন স্টুয়ার্ট মিল বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এই সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার। গায়ের জোরে অন্যকে দাবিয়ে রাখা বা সংখ্যায় বেশি বলে অন্যের সংস্কৃতি ও অধিকারকে অস্বীকার করা আদিম প্রবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক নয়। গণতন্ত্র বিশ্বাস করে যে, রাষ্ট্রের কাছে একজন সংখ্যালঘু নাগরিক এবং একজন সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের জীবনের মূল্য সম্পূর্ণ সমান। সংখ্যাগুরুরা চাইলেই সংখ্যালঘুর অধিকার কেড়ে নিতে পারে না, কারণ সেখানে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের সংবিধান এবং মানবাধিকার। সংবিধানে এমন কিছু মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ থাকে, যা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৯৯% ভোট পেলেও গণতান্ত্রিক উপায়ে হরণ করা যায় না।

এই ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, নির্বাচিত প্রতিনিধি জনতার ক্ষোভ বা আবেগের অন্ধ দাসে পরিণত হবেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডমন্ড বার্কের ‘ট্রাস্টি মডেল’ অনুযায়ী, জনগণ একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে তার প্রজ্ঞা, মানবিকতা এবং দূরদর্শিতার ওপর আস্থা রেখে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে যে, সবচেয়ে মানবিক ও যোগ্য মানুষটি দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং সবাইকে নিয়ে সামনে এগোবেন। সেই প্রতিনিধি নিশ্চিত করবেন যেন ৭০% মানুষের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে ৩০% মানুষের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার না হয়। মব যদি কোনো অমানবিক দাবিও করে, প্রতিনিধির দায়িত্ব হলো নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে সঠিক কাজটি করা এবং উন্মত্ততাকে নিবৃত্ত করা। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মাঝে মাঝে ক্ষুব্ধ হতে পারে এই ভেবে যে তাদের চেয়ে সংখ্যালঘুকে বেশি অধিকার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মূলত সংখ্যালঘুর সেই অধিকারটুকু নিশ্চিত করাই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের কাজ।

অন্যদিকে, ডেমোগ্রাফিক বুলিং সমাজকে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করতে চায় এবং সেই পরিচয়ের বাইরের মানুষদের রাষ্ট্রে ‘অতিথি’ বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু গণতন্ত্র হলো বহুত্ববাদী। এটি বিশ্বাস করে যে একটি রাষ্ট্রে নানা মত, নানা পথ ও নানা পরিচয়ের মানুষ থাকবে এবং সবাই এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। ডেমোগ্রাফিক বুলিংয়ের সমাজে মব বা উন্মত্ত জনতাই বিচারক হয়ে যায়, রাজপথে নেমে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়াকে তারা নিজেদের অধিকার মনে করে। অথচ গণতন্ত্রে বিচারব্যবস্থা থাকে অন্ধ ও বস্তুনিষ্ঠ। সেখানে অপরাধীর বা ভুক্তভোগীর ডেমোগ্রাফিক পরিচয় দেখা হয় না; সংখ্যাগরিষ্ঠের একজন অপরাধ করলে সে যে শাস্তি পাবে, সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রেও ঠিক একই আইনের প্রয়োগ হয়।

পরিশেষে বলা যায়, গণতন্ত্র কোনো জিরো-সাম গেম নয় যে, একজনকে অধিকার দিলে আরেকজনের অধিকার কমে যাবে। কিন্তু এই বোধটুকু তৈরি না হওয়ায়, সমাজে মব জাস্টিসকেই সত্যিকারের বিচার এবং মবের ইচ্ছাকেই গণতন্ত্র মনে করার এক ভয়াবহ চর্চা শুরু হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক বুলিং হলো মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠের পেশিশক্তির আস্ফালন, যা প্রকারান্তরে একধরনের ফ্যাসিবাদেরই জন্ম দেয়। যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ বুঝতে শিখবে যে, গণতন্ত্র মানে গায়ের জোরে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়, বরং অন্যের অধিকার রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে মানবিক ও যোগ্য মানুষটিকে নির্বাচিত করা, ততক্ষণ পর্যন্ত একটি সাম্যবাদী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়।

#

No responses yet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Page Views
6021

JOIN US!

Join Us!